রাজধানীসহ সারাদেশে অদৃশ্য অরাজকতায় যড়যন্ত্রের আভাস দিচ্ছে নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাÐে। সামান্য থেকে বড় ধরনের যেকোন ইস্যুতে রাজপথ দখলে নিয়ে সরকারকে বাধ্য করা হচ্ছে বিভিন্ন দাবি আদায়ে, ফেলা হচ্ছে বিপাকে। গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, কলকাতা থেকে দেশকে অস্থিশীল করতে বিপুল অর্থ ঢালছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। প্রকাশ্যে না থাকলেও ছদ্মবেশে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে দেখা যাচ্ছে দলটির পলাতক নেতাকর্মীদের। আর এইভাবে নানামুখী ধারাবাহিক কার্যকমে গোপন কোনো একটি বড় পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জানা গেছে, নিষিদ্ধপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ এখন প্রকাশ্যে রাজনীতির মাঠে নেই। কিন্তু তাদের কার্যকলাপের ধরন বলছে, তারা আসলে ছদ্মবেশে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দ্ব›দ্ব, নার্স ও কৃষি ডিপ্লোমা সংকট, বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ, ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিরতা, এসব জায়গায় তাদের হাত রয়েছে বলে গোয়েন্দা রিপোর্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ভেতরে অনুপ্রবেশ, সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে উসকানি ছড়ানো কিংবা সংঘর্ষ উসকে দেয়া সবই একটি বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার। এ বৃহত্তর লক্ষ্য হলো ফেব্রæয়ারিতে ঘোষিত জাতীয় নির্বাচন ঠেকানো। দেশে রাজনীতিতে হঠাৎ করেই দেখা দিচ্ছে একের পর এক বিচ্ছিন্ন আন্দোলন। কখনো শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, কখনো পেশাজীবী শ্রেণির দাবিতে উত্তেজনা, আবার কখনো ক‚টনৈতিক এলাকাকে ঘিরে আতঙ্ক। বাইরে থেকে এগুলো যেন আলাদা আলাদা ইস্যু, কিন্তু গভীরে গেলে প্রশ্ন জাগে এসব কি সত্যিই স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি এর পেছনে বড় কোনো পরিকল্পনা সক্রিয়?
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কলকাতায় অফিস খুলে সেখান থেকে বাংলাদেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঢালছে আওয়ামী লীগ। এ অর্থ ব্যবহার হচ্ছে আন্দোলন চাঙা করতে এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একধরনের দ্বিচারিতা দেখা যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ প্রকাশ্যে নির্বাচন সমর্থন জানালেও গোপনে একই দলের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার ছক আঁকছে। এতে স্পষ্ট, ছোট আন্দোলনের আড়ালে একটি আঞ্চলিক শক্তির কৌশলও কাজ করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্ব নতুন করে বলার কিছু নেই। সে ইতিহাস মাথায় রেখেই এবারও ছাত্র আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে আওয়ামী লীগ। প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশ, বুয়েটে সক্রিয়তা, পালিয়ে থাকা নেতাদের উপস্থিতি-সবই প্রমাণ করে তারা ছাত্র আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক লাভ তুলতে চাইছে। অর্থ সংকট কাটিয়ে এখন আবার তারা রাজপথে শক্তি প্রদর্শনে নেমেছে। একইসঙ্গে সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ও মুক্তিযোদ্ধা ইস্যুও ব্যবহৃত হচ্ছে আবেগী হাতিয়ার হিসেবে। ‘মঞ্চ ৭১’-এর মতো সংগঠনকে সামনে এনে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ কাজে লাগানো হচ্ছে। স¤প্রতি আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর উপস্থিতি এবং তার চারপাশে প্রচারণা- এসব আসলে অরাজকতাকে সাংস্কৃতিক মোড়কে ঢেকে দেয়ার প্রচেষ্টা। ছোট ইস্যুর মোড়কে বড় রাজনৈতিক ছক এখানেই ধরা পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এত মরিয়া আওয়ামী লীগ? উত্তর স্পষ্ট-একবার নির্বাচন হয়ে গেলে তাদের জন্য আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। শেখ হাসিনার বয়স ও শারীরিক অবস্থা, বিকল্প নেতৃত্বের অভাব-সব মিলিয়ে দলটির রাজনৈতিক পুনরুত্থান প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। তাই তারা যেকোনো মূল্যে নির্বাচন ঠেকাতে চাইছে। ছোট ছোট আন্দোলন তাদের কাছে বড় বিস্ফোরণের বারুদ।
এখন সরকারের জন্য বড় প্রশ্ন হলো-কীভাবে এ বহুমুখী চক্রান্ত রুখে দেয়া যাবে? যদি সরকার কেবল আন্দোলন দমনেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দমননীতি হিসেবে প্রশ্ন উঠবে। আর যদি সরকার দুর্বলতা দেখায়, তবে পতিত শক্তি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। এ জটিল সঙ্কটের মাঝখানেই আজ বাংলাদেশের রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো-ছোট ছোট আন্দোলনের হঠাৎ বিস্ফোরণ আসলে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার আংশিক প্রতিফলন। বিদেশি অর্থায়ন, সাংগঠনিক অনুপ্রবেশ, সাংস্কৃতিক আবেগ এবং ছাত্র আন্দোলনের শক্তি-সবকিছুকেই একত্রে ব্যবহার করে নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, ষড়যন্ত্র যত গভীরই হোক, জনগণের ইচ্ছাশক্তি এবং রাষ্ট্রের দূরদৃষ্টি থাকলে তা ব্যর্থ হয়। ফেব্রæয়ারির নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশ এখন সে পরীক্ষার মুখোমুখি। ছোট আন্দোলন যদি বড় চক্রান্তের বাহন হয়, তবে তার জবাবও বড় ঐক্য আর গণতান্ত্রিক শক্তির দৃঢ়তায় দিতে হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম বলেছেন, আওয়ামী লীগের মূল উদ্দেশ্য নির্বাচন বানচাল করা। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. রাশেদ আলম ভ‚ঁইয়া মনে করেন, পতিত ফ্যাসিবাদের হাতে বিপুল অর্থ, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী শক্তি রয়েছে, যা তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে ব্যবহার করছে। এসব বিশ্লেষণই প্রমাণ করে, ছোট আন্দোলনগুলোর পেছনে কেবল ক্ষোভ নয়, বরং সংগঠিত ষড়যন্ত্র সক্রিয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে অদৃশ্য শত্রæ। প্রশাসনের মধ্যে এখনো স্বৈরাচারের ভ‚ত লুকিয়ে আছে। যারা জীবন দিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্য ছিল এদেশের পরিবর্তন হবে, মানুষের ভাগ্যের একটু পরিবর্তন হবে। এদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ মনে করে বিএনপির সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে এবং বিএনপিই আগামীতে ক্ষমতায় আসবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

* প্রকাশ্যে না থাকলেও ছদ্মবেশে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ * গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী কলকাতা থেকে বিপুল অর্থ ঢালছে দলটি * নানামুখী বিচ্ছিন্ন আন্দোলনে গোপন পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিচ্ছে
অদৃশ্য অরাজকতায় ষড়যন্ত্রের আভাস
- আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ১২:৩১:০৪ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ১২:৩১:০৪ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ